লেখক: ডঃ মোঃ জয়নুল আবেদীন রোজ
সভাপতি, যুক্তরাজ্য অনলাইন প্রেসক্লাব
ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চারিত হলে মানুষের মনে কেবল একজন ব্যক্তির পরিচয়ই ভেসে ওঠে না; জেগে ওঠে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিশ্বাসভঙ্গ ও জাতীয় বিপর্যয়ের স্মৃতি। মীরজাফর ও খন্দকার মোশতাক আহমদ তেমনই দুটি নাম। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও তাঁদের পাশে যুক্ত হয়েছে বলে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন। তাঁদের অভিযোগ, তাঁর অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগের মুখে নির্লিপ্ত আচরণ তাঁকে ব্যাপক জনরোষের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে তাঁর বিতর্কিত উচ্চারণ, ‘মেটিকুলাস প্ল্যান’ ও ‘রিসেট বাটন’, কোটি মানুষের মনে ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে বলে সমালোচকদের দাবি।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাময় মোড়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মীরজাফর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গোপন সমঝোতায় যুক্ত হয়ে যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নিষ্ক্রিয়তা ও পক্ষত্যাগ নবাবের পরাজয় সহজ করে দেয় এবং বাংলায় কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যায়। সেই থেকে ‘মীরজাফর’ নামটি বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থে জনস্বার্থ বিসর্জনের এই ইতিহাস আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
এর দুই শতাধিক বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশ আরেকটি নির্মম অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন তাঁরই রাজনৈতিক সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদ। সেই হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় স্মৃতিতে গভীর নিন্দার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যের বাহ্যিক পরিচয় এবং ক্ষমতার পালাবদলে তাঁর অবস্থানের বৈপরীত্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে আস্থাভঙ্গের এক স্থায়ী উদাহরণ।
তাহলে ড. ইউনূসের প্রসঙ্গ কেন উঠছে? ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। এই মেয়াদে তাঁকে ঘিরে প্রবল সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে জননিরাপত্তার অবনতি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। এ ছাড়া হামের টিকাদান কার্যক্রমে অবহেলার কারণে শত শত শিশুর মৃত্যু ও হাজার হাজার শিশুর আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার কর মওকুফের বিতর্ক, দেশ পরিচালনায় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই বলে সমালোচিত বিভিন্ন এনজিওপ্রধানকে মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দল ও মতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও তাঁর শাসনামলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্নটি জননিরাপত্তা নিয়ে। ইউনূসের শাসনামলে গণপিটুনি, প্রতিশোধমূলক হামলা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, তাঁর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর শাসনামলে সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা, মতপ্রকাশের কারণে হেনস্তা, অন্যায়ভাবে সাংবাদিকদের আটক এবং সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ রাষ্ট্রের সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলে ধরেছে। ভুক্তভোগী যে দলের, ধর্মের কিংবা মতেরই হোন না কেন, নিরপেক্ষ তদন্ত, সুরক্ষা এবং বিচার পাওয়া তাঁর অধিকার। কোনো রাজনৈতিক বিজয়ের নামে মব-সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া যায় না।
যে সরকারই দায়িত্বে থাকুক না কেন, টিকাদান, পুষ্টি, নিরাপদ চিকিৎসা ও সহিংসতা থেকে শিশুদের রক্ষায় ব্যর্থতার জবাবদিহি তাকে করতেই হবে। শিশুদের কান্না রাজনৈতিক বিতর্কের হাতিয়ার হতে পারে না; এটি রাষ্ট্রের বিবেক ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক কঠিন পরীক্ষা।
রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলটির নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠবেই। অপরাধের দায় ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা—এই দুটি কর্তব্য একে অপরের বিরোধী নয়।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি কোনো আসন পায়নি। দলটির নেতারা নির্বাচনের ফলাফলে কারসাজির অভিযোগ তুলে দাবি করেছেন, রংপুর জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ইউনূস প্রশাসনের প্রভাব খাটিয়ে জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে, বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক সমর্থকের দাবি অগ্রাহ্য করে দলটি তথা নৌকা প্রতীককে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তকে ড. ইউনূসের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম নিন্দনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তাঁর সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃণাকে আরও উসকে দিয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি।
জাতীয় স্মৃতির ওপর আঘাত আরও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাসভবন ও স্মৃতি জাদুঘর ভাঙচুরের শিকার হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ভাস্কর্য ও স্মৃতিচিহ্নও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও চলতে পারে; কিন্তু জাতীয় ঐতিহ্য ধ্বংসের অনুমতি কোনো মতাদর্শ দিতে পারে না। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ তাঁর নেই।
এদিকে গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার করসংক্রান্ত বিতর্ক জনস্বার্থে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর শাসনামলে এই বিপুল অঙ্কের কর মওকুফ করা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন সরকারের আমলে হাইকোর্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দাবির পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং অক্টোবরে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা যায়। প্রতিষ্ঠানটির আপিল করার অধিকার রয়েছে; একই সঙ্গে জনগণেরও জানার অধিকার রয়েছে, করসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না।
ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা প্রতিহিংসা নয়, বরং সত্য প্রতিষ্ঠা, দলমতনির্বিশেষে মানবাধিকার রক্ষা, অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি অক্ষুণ্ণ রাখা।
মীরজাফর ও মোশতাকের নাম ইতিহাসে যেভাবে বিশ্বাসভঙ্গ ও জাতীয় বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে রয়েছে, ড. ইউনূসের শাসনামলও সেভাবেই ইতিহাসের কঠোর বিচারের মুখোমুখি হবে। একজন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ব্যক্তির কাছে দেশের সকল মানুষের সমান অধিকার আশা করলেও প্রকৃত পক্ষে তার শাসনামলে তার ঠিক বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে!
https://slotbet.online/