শাহ লাভলী রহমান: প্রবাসে বসে বাংলাদেশের খবর পড়তে পড়তে কখনো কখনো মনে হয়, দূরত্ব মানুষের চোখকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু মৃত্যু দূরত্ব মানে না। একটি শিশুর ছবি লন্ডনের একটি ঘরের পর্দায় ভেসে ওঠে, আর হঠাৎ মনে হয় এই শিশুটি তো আমারও হতে পারত। এই সংবাদ পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকা ছাড়া আর কী করা যায়? সাত বছরের একটি শিশু কতটা বড় স্বপ্ন দেখতে পারে? হয়তো খুব বেশি নয়। একটি নতুন জামা, স্কুলের একটি খাতা, মায়ের হাত ধরে কোথাও যাওয়া, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা এই তো তার পৃথিবী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের ছোট্ট মাহিদার পৃথিবীও হয়তো এমনই ছিল। কিন্তু সেই পৃথিবী আর নেই। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাত বছর বয়সী মাহিদা আক্তারের মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তে তার শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শ্বাসরোধের কথা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলা তদন্তাধীন। মাহিদা আমাদের সন্তান নয়। তবুও সে আমাদেরই শিশু। এই কথাটিই আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। একটি শিশুর নিরাপত্তা কার দায়িত্ব? ঘটনা ঘটার পর আমরা স্বাভাবিকভাবেই বিচার চাই। অপরাধীর শাস্তি চাই। দ্রুত তদন্ত চাই। এসব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন করতে হবে অপরাধটি ঘটার আগের সময়টুকুতে শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য আমরা কী করেছিলাম?
কারণ একটি শিশুকে হারানোর পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুরু হয় না। তার দায়িত্ব শুরু হয় শিশুটি বেঁচে থাকার সময় থেকেই। শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কার ওপর পরিবার বিশ্বাস করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার নিরাপত্তা কেমন, অভিযোগ করলে সে কোথায় যাবে এসব প্রশ্নকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করতে হবে। শুধু শিশুকে বলা ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না’ এখন আর যথেষ্ট নয়। কারণ শিশু নির্যাতনের অনেক ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুর পরিচিত বৃত্তের মধ্যেই থাকে। তাই শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, সচেতন করে নিরাপদ করতে হবে। তাকে শেখাতে হবে তার শরীর তার নিজের; অস্বস্তিকর স্পর্শে ‘না’ বলার অধিকার তার আছে; কোন প্রাপ্তবয়স্ক তাকে ভয় দেখিয়ে কোন ঘটনা গোপন রাখতে বললে সেটি বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই; এবং কোন কিছু ঘটলে সে যেন নির্ভয়ে মা-বাবা, শিক্ষক বা বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রাপ্তবয়স্ককে বলতে পারে। মাহিদার জন্য শুধু শাস্তি যথেষ্ট নয়।
মাহিদা আর ফিরবে না। এই সত্যটাই সবচেয়ে নির্মম। তার মা হয়তো এখনো বিশ্বাস করতে চাইছেন, দরজা খুললেই মেয়েটি ফিরে আসবে। হয়তো তার ছোট্ট জামা, বই বা খেলনা এখনো ঘরের কোথাও পড়ে আছে। কোন আদালতের রায় সেই শিশুটিকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তবুও বিচার প্রয়োজন। কারণ বিচার মাহিদাকে ফিরিয়ে আনবে না, কিন্তু অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করবে। আর তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন প্রতিরোধ। কারণ আমরা যদি শুধু প্রতিটি হত্যার পর শাস্তি দাবি করি, তাহলে আমরা অপরাধের পরের অধ্যায় নিয়ে কথা বলছি। আমাদের কথা বলতে হবে অপরাধের আগের অধ্যায় নিয়েও।
কেন একটি শিশু নিরাপদ নয়?
কেন পরিবারকে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়?
কেন শিশুদের জন্য নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা আরও সহজলভ্য হবে না?
কেন স্কুল, মাদ্রাসা, কোচিং, পাড়া-মহল্লা প্রতিটি জায়গায় শিশুর নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যবস্থা থাকবে না? এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার শেষ হবে না। একটি ছবি, একটি নাম, একটি অসমাপ্ত জীবন। মাহিদার ছবি দেখলে মনে হয়, ছবির শিশুটি বুঝতেই পারেনি তার সামনে কী অপেক্ষা করছে। শিশুরা পৃথিবীকে বিশ্বাস করে। আমরাই তাদের শেখাই এই পৃথিবী নিরাপদ। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন শুধু একটি শিশুই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; তার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের সামাজিক বিশ্বাসও। একটি শিশুর চোখে পৃথিবী যদি অন্ধকার হয়ে যায়, তবে সেই অন্ধকারের দায় শুধু অপরাধীর নয়, আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাকেও আয়নায় দাঁড়াতে হবে। এখানে কোন রাজনৈতিক দল নেই, কোন মতাদর্শ নেই, কোন ধর্মীয় বিভাজন নেই, আছে শুধু একটি শিশু। একটি পরিবার, একটি মৃত্যু আর আমাদের বিবেক। আমরা কি আবার ভুলে যাব?
বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও হত্যার বহু ঘটনা প্রতিবছর নথিভুক্ত হচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানেও ২০২৬ সালে শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতার একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে। কিন্তু পরিসংখ্যানের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো কয়েক মাস পর আমরা সংখ্যাটি ভুলে যাই। কারণ সংখ্যার মুখ নেই, মাহিদার মুখ আছে, তার নাম আছে, তার বয়স আছে, তার একটি পরিবার আছে, তার একটি অসমাপ্ত শৈশব আছে। তাই মাহিদাকে শুধু ‘সাত বছরের শিশু হত্যার ঘটনা’ হিসেবে মনে রাখলে চলবে না। মনে রাখতে হবে মাহিদা নামে একজন শিশু ছিল।
সে বেঁচে থাকলে হয়তো আরও বহু বছর পৃথিবী দেখত। হয়তো বড় হয়ে কোন পেশা বেছে নিত। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ তাকে দেওয়া হলো না। তার ভবিষ্যৎ আমাদের চোখের সামনে থেমে গেল। শেষ প্রশ্নটি আমাদের। আজ মাহিদার জন্য আমরা শোক করছি। আগামীকাল হয়তো আরেকটি শিশুর খবর আসবে। আমরা আবার কাঁদব, আবার প্রতিবাদ করব, আবার বিচার চাইব, তারপর? আরেকটি সংবাদ এসে আগের সংবাদকে সরিয়ে দেবে। এভাবেই কি একটি শিশুর মৃত্যু ধীরে ধীরে আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে?
না, মাহিদার মৃত্যুকে শুধু একটি দিনের খবর হতে দেওয়া যাবে না। তার নাম একটি প্রশ্ন হয়ে থাকুক। একটি প্রশ্ন যার উত্তর আমাদের পরিবারকে দিতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে, প্রশাসনকে দিতে হবে, রাষ্ট্রকে দিতে হবে এবং আমাদের প্রত্যেককেও দিতে হবে। কারণ একটি শিশুকে হারানোর পর তার জন্য কাঁদা মানবিকতা; কিন্তু শিশুটিকে হারানোর আগেই তাকে নিরাপদ রাখা সেটিই সভ্যতার পরিচয়। মাহিদা, তুমি আর ফিরবে না। কিন্তু তোমার নাম যদি আমাদের বিবেকের দরজায় একটি কড়া নাড়ে, তবে সেই কড়া নাড়ার শব্দটি যেন থেমে না যায়।
আর কোন মাহিদা যেন আমাদের কাছে শুধু একটি ছবি, একটি সংবাদ, কিংবা একটি সংখ্যা হয়ে না আসে।
https://slotbet.online/