১৫ আগস্ট ১৯৭৫: যে রাজনৈতিক সংকটের পরিণতিতে বদলে গেল বাংলাদেশের ইতিহাস
বেল্লাল হোসেন বাবু, সহকারী বার্তা সম্পাদক : স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। একইসঙ্গে সামরিক বাহিনীর একদল সদস্যের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।
১৯৭৫ সালের সেই পরিস্থিতি বুঝতে হলে স্বাধীনতার পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির অভিযোগ, সরকারের সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক—সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
অর্থনৈতিক সংকট ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সামনে ছিল পুনর্গঠন, খাদ্যসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক চাপের মতো বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যেই ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছিল। বন্যা, খাদ্যশস্যের দাম বৃদ্ধি, বাজার ও খাদ্যবণ্টন ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—এসব বিষয় দুর্ভিক্ষকে আরও তীব্র করে। এ দুর্ভিক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বড় মাত্রার গণঅনাহারের ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
তৎকালীন পরিস্থিতিতে খাদ্যশস্যের মজুত, বণ্টন ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা অভিযোগ ও সমালোচনা ছিল। তবে এসব ঘটনার ক্ষেত্রে সব অভিযোগকে একই মাত্রায় প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন না করে সমকালীন সংবাদপত্র, সরকারি নথি ও পরবর্তী গবেষণার ভিত্তিতে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
চতুর্থ সংশোধনী ও বাকশাল
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা হয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল—গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ সময় দেশের প্রচলিত বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে একটি জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ব্যবস্থাকে সমর্থকেরা জাতীয় ঐক্য ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও বিরোধীরা এটিকে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করার পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া
১৯৭৫ সালের জুনে সরকারের সিদ্ধান্তে অধিকাংশ সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায় এবং চারটি দৈনিক—দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস—প্রকাশের অনুমতি পায়। ইউনেস্কোর একটি ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে ওই সময় চারটি দৈনিক ছাড়া অন্য সংবাদপত্র বন্ধ এবং অবশিষ্ট পত্রিকাগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ফলে সরকারের সমালোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বলে পরবর্তী ঐতিহাসিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
প্রশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অসন্তোষ
স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চোরাচালান এবং দুর্নীতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়তে থাকে। একই সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটকে শুধুমাত্র ‘দুর্নীতি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসসম্মত নয়। গবেষকদের মূল্যায়নে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন, প্রশাসনিক সমস্যা, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—সবকিছু মিলিয়েই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছিল।
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীও নানা সাংগঠনিক ও পেশাগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে দায়িত্ব, পদায়ন, সুযোগ-সুবিধা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি পরবর্তী ঐতিহাসিক আলোচনায় এসেছে।
বিশেষ করে জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সম্পর্ক, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সামরিক কর্মকর্তাদের দূরত্ব এবং কয়েকজন তরুণ সেনা কর্মকর্তার অসন্তোষ ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের পটভূমি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একদল সদস্য ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে হামলা চালায়। শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে নিহত হন। তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যও ওই ঘটনায় নিহত হন। সে সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান।
ঘটনাটি ছিল শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের একটি সামরিক অভ্যুত্থানও যুক্ত ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নতুন সরকার গঠিত হয়।
হত্যাকাণ্ডের বিচার
১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পরপরই এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, যার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এ আইনি সুরক্ষা বাতিল হয় এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০০৯ সালে মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাসের কঠিন শিক্ষা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে দেখলে ওই সময়ের পূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা কঠিন। আবার শুধু অর্থনৈতিক সংকট বা দুর্নীতিকে হত্যাকাণ্ডের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাও ইতিহাসের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে সরলীকরণ করবে।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকোচন, বাকশাল ব্যবস্থা, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং সেনাবাহিনীর একটি অংশের অসন্তোষ—এসব উপাদান ১৯৭৫ সালের সংকটকে গভীর করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে নতুন এক অধ্যায়ে নিয়ে যায়।
https://slotbet.online/