লোকদেখানো সংস্কৃতি: মানসিক শান্তি ও সামাজিক বন্ধনের অন্তরায়
সোহেল সরকার
প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক প্রতিবাদ
বর্তমান যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক বড় অংশ দখল করে নিয়েছে ‘শো-অফ’ বা লোকদেখানোর প্রবণতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের ফলে এটি যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কোথায় যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, কী কিনছি বা আমাদের অর্জন কী—সবকিছুই জনসমক্ষে জাহির করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চারপাশে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কৃত্রিম এই বাহ্যিক চমকের পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ভেতরের খাঁটি আবেগ, আন্তরিকতা ও মানসিক প্রশান্তি।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, লোকদেখানোর মূল কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের মানসিক অসন্তুষ্টি ও আত্মবিশ্বাসের অভাব। মানুষ যখন অন্যের কাছ থেকে সাময়িক প্রশংসা বা মনোযোগ পেয়ে নিজের মূল্য বিচার করতে শুরু করে, তখনই শো-অফের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ে। তবে এই সাময়িক বাহবা পাওয়ার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী। এর ফলে তৈরি হয় এক ধরনের মানসিক চাপ এবং ক্রমাগত অন্যের চেয়ে নিজেকে ভালো দেখানোর এক ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই প্রবণতা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সমাজের সর্বস্তরে এক ধরনের অদৃশ্য বৈষম্য ও হিংসাবোধের জন্ম দিচ্ছে এই কৃত্রিম জীবনধারা। যারা বাস্তবে সামর্থ্যবান নন, তারাও প্রায়ই লোকলজ্জার ভয়ে বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে অপচয় ও ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোতে যে আন্তরিক টান থাকার কথা ছিল, তা জায়গা করে নিচ্ছে বাহ্যিক প্রদর্শনীতে।
তবে এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার উপায় আমাদের হাতেই রয়েছে। প্রথমত, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বা বস্তুগত সাফল্য প্রদর্শনের মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আত্মতৃপ্তি ও বিনয় চর্চা করা প্রয়োজন। প্রকৃত ব্যক্তিত্ব কখনো দামি পোশাক, গাড়ি কিংবা লোকদেখানো লাইফস্টাইলে তৈরি হয় না; তা তৈরি হয় মানুষের আচরণ, শিক্ষা ও চিন্তাধারার মাধ্যমে।
সাদামাটা ও বিনয়ী জীবনযাপন মানুষকে সত্যিকারের স্বাধীনতা দেয়। অন্যের স্বীকৃতির ওপর নিজের সুখ নির্ভর না করে, ভেতরের আত্মতৃপ্তিকে প্রাধান্য দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। লোকদেখানোর অহেতুক প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের মুক্ত রেখে আসুন আমরা একটি আন্তরিক, বিনয়ী ও সুসংহত সমাজ গড়ে তুলি।
https://slotbet.online/