চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ১১ নম্বর চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে কর্ণফুলী নদীর ভাঙন। টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও নদীর তীব্র স্রোতে জেলে পাড়া, ফকির পাড়া, মোল্লাহ পাড়া, খোন্দকার পাড়া ও হাজী পাড়ার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক। প্রতিদিনই নদীর পাড় ভেঙে বসতভিটা ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা এসব এলাকায় কার্যকর ও স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের সময় নদীর স্রোত বাড়লেই ভাঙনের তীব্রতাও বেড়ে যায়। এরই মধ্যে নদীর পাড়ের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কয়েকটি পাড়ার শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ। অনেক পরিবারের নিজস্ব জমি-জমা নেই। বসতভিটাটুকুই তাদের শেষ আশ্রয়। নদী আরও এগিয়ে এলে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন—এ নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের।
জেলে পাড়ার বাসিন্দা মাখন জল দাশ বলেন, “আমরা দিনে এনে দিনে খাই। নিজেদের কোনো জমি নেই। নদী এভাবে ভাঙতে থাকলে আমাদের শেষ আশ্রয়টুকুও থাকবে না। মাননীয় সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর কাছে আমাদের আকুল আবেদন, দ্রুত নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
মোল্লাহ পাড়ার বাসিন্দা মোর্শেদ বলেন, “নদীভাঙন যেভাবে বাড়ছে, তাতে ঘরবাড়ি ও বসতভিটা নিয়ে আমরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। আমরা গরিব মানুষ, অন্য জায়গায় গিয়ে বসবাস করার সামর্থ্য নেই। দ্রুত নদীর পাড়ে পাথর ও কংক্রিটের সিসি ব্লক বসিয়ে ভাঙন রোধ করতে হবে। সময় থাকতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
স্থানীয় জাহির মেম্বার, শাহ আলম, সাইফুল, রুকসানা ও আবু নাসেরসহ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, শুধু সাময়িক মেরামত করে নদীভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষার ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে নদীতীর সংরক্ষণ করতে হবে। তাদের দাবি, পাথর ও কংক্রিটের সিসি ব্লক দিয়ে তীর সংরক্ষণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসনের ব্যবস্থা করা হোক।
চন্দ্রঘোনা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ এম আনোয়ারুল হক বাবুল বলেন, “নদীভাঙনে দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা আশা করি, মাননীয় সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। চন্দ্রঘোনার হাজারো মানুষ এখন তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে নদীভাঙন রোধে কিছু কাজ হলেও সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কাজের মান ও বাস্তবায়ন নিয়ে যথাযথ নজরদারি না থাকায় আগের প্রতিরোধব্যবস্থা টেকসই হয়নি বলে তাদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি। স্থানীয়রা এবার সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে পরিকল্পিত ও টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা চান।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, “কর্ণফুলী নদীর ভাঙনের বিষয়টি আমরা অবগত আছি। এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন কাজ। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আমরা ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছি। সরকারের বাজেট প্রণয়ন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে আশা করছি, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে নদীভাঙন প্রতিরোধে কাজ করা সম্ভব হবে।”
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য বাজেট ও বরাদ্দের অপেক্ষার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের সময় ভাঙন আরও তীব্র হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশে পাথর ও সিসি ব্লক দিয়ে নদীর তীর রক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কর্ণফুলীর ভাঙনে শুধু বসতভিটাই নয়, চন্দ্রঘোনার ঐতিহ্যবাহী পাঁচটি পাড়ার জনজীবনও মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
https://slotbet.online/