দুই বছরও পূর্ণ হলো না জুলাই বিপ্লবের। অথচ যে স্বপ্ন একদিন মানুষের চোখে নতুন ভোরের আলো জ্বেলেছিল, আজ সেই স্বপ্নের আকাশে জমেছে বিভেদের কালো মেঘ। যে কণ্ঠ একদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল, আজ সেই কণ্ঠের ভেতর শোনা যায় অভিযোগের প্রতিধ্বনি। যে হাত একদিন পরস্পরের হাত ধরে পরিবর্তনের পথে এগিয়েছিল, আজ সেই হাতের মাঝখানে সন্দেহ, প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার দূরত্ব।
জুলাই ছিল শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়; জুলাই ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ, অবহেলিত মানুষের আকাঙ্ক্ষার ভাষা, তরুণ প্রজন্মের সাহসী উচ্চারণ। সেখানে ছিল একটি স্বপ্ন—রাষ্ট্র হবে মানুষের, ক্ষমতা হবে জবাবদিহির, আইন হবে সবার জন্য সমান এবং ভবিষ্যৎ হবে বৈষম্য ও ভয়মুক্ত।
কিন্তু বিপ্লবের পথ যতটা উজ্জ্বল, তার পরের পথ ততটাই কঠিন। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ হতে পারে, কিন্তু ন্যায়ের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করা কঠিন। পুরোনো শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব, কিন্তু সেই ঐক্যকে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার মোহ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে ধরে রাখা আরও কঠিন।
আজ প্রশ্ন উঠছে—জুলাই বিপ্লব দ্বিধাবিভক্ত কেন?
এর উত্তর কোনো এক ব্যক্তি, কোনো একটি দল কিংবা কোনো একটি গোষ্ঠীর কাছে সীমাবদ্ধ নয়। এই বিভেদের দায় বহন করতে হবে সবাইকে—যারা বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা এর সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা করেছেন, যারা রাজনীতির পুরোনো পথ ধরে নতুন সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন এবং যারা নীরব থেকে বিভেদের আগুনকে জ্বলতে দিয়েছেন।
বিপ্লবের সময় মানুষ এক হয়েছিল একটি অভিন্ন স্বপ্নে। কিন্তু পরিবর্তনের পর সেই স্বপ্নের জায়গায় যখন ‘আমি’ বড় হয়ে ওঠে, তখন ‘আমরা’ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়। যখন আন্দোলনের ইতিহাসকে নিজেদের একার কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরার প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন ত্যাগের স্মৃতি বিভক্ত হয়। যখন জনকল্যাণের চেয়ে ক্ষমতার হিসাব বড় হয়ে ওঠে, তখন আদর্শের পতাকায় স্বার্থের ছায়া পড়ে।
আজ ক্যাম্পাস উত্তপ্ত, রাজপথ অস্থির, রাজনীতির আঙিনায় অনিশ্চয়তা। মানুষের মনে আবারও প্রশ্ন—যে পরিবর্তনের জন্য এত ত্যাগ, এত অশ্রু, এত রক্ত, সেই পরিবর্তনের ঠিকানা কোথায়?
মানুষ কি কেবল ক্ষমতার মুখ বদলাতে চেয়েছিল? নাকি তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে?
নতুন মুখ যদি পুরোনো আচরণে ফিরে যায়, নতুন নেতৃত্ব যদি পুরোনো ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে, নতুন দিনের রাজনীতি যদি আবারও দখল, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের পথে হাঁটে—তবে বিপ্লবের প্রকৃত অর্থ কোথায়? ক্ষমতার চেয়ার বদলালেই কি রাষ্ট্র বদলায়? পতাকা বদলালেই কি মানুষের ভাগ্য বদলে যায়?
রাষ্ট্র তখনই বদলায়, যখন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। যখন আইন ব্যক্তি বা দলের পরিচয়ে নয়, ন্যায় ও সত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। যখন প্রশাসন ক্ষমতাবানদের নয়, জনগণের সেবক হয়ে ওঠে। যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কারও পরিচয় জানতে হয় না। যখন বিচার বিলম্বিত হয় না এবং জবাবদিহি কেবল বক্তৃতার অলংকার হয়ে থাকে না।
আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই—আমরা ব্যক্তি ও দলকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় করে দেখি। আমরা নেতৃত্বকে প্রশ্ন করার পরিবর্তে তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করি। আমরা নীতির চেয়ে পরিচয়কে, রাষ্ট্রের চেয়ে দলকে এবং ভবিষ্যতের চেয়ে তাৎক্ষণিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দিই। ফলে মানুষ বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের পুরোনো ক্ষতগুলো রয়ে যায়।
তবু সব আশা কি শেষ?
না। ইতিহাসের পথ কখনো সরল নয়। প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পর আসে সংশয়, মতভেদ ও পথের দ্বন্দ্ব। কিন্তু সেই দ্বন্দ্ব যদি আত্মসমালোচনার পথ খুলে দেয়, যদি বিভাজন আমাদের আবারও মূল আদর্শে ফিরিয়ে নেয়, তবে এই সংকটও হতে পারে নতুন উপলব্ধির সূচনা।
আজ প্রয়োজন কৃতিত্বের মালিকানা নিয়ে বিবাদ নয়; প্রয়োজন দায়িত্বের অংশীদার হওয়া। প্রয়োজন কে কত বড় নেতা—সেই প্রশ্ন নয়; বরং কে কতটা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ—সেই প্রশ্ন। প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা নয়; বরং ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য হিসেবে গ্রহণ করা।
জুলাইয়ের চেতনা কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। এটি সেই তরুণের, যে ভয়কে উপেক্ষা করে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল; সেই মায়ের, যিনি সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত থেকেও পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন; সেই শ্রমজীবী মানুষের, যিনি ভেবেছিলেন—হয়তো এবার রাষ্ট্র তার কথাও শুনবে। জুলাইয়ের চেতনা বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা।
এই আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি থেকে নীতির রাজনীতিতে ফিরতে হবে। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের ভিত্তি করতে হবে। বিভেদ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—বিপ্লব ঘটানো কঠিন, কিন্তু বিপ্লবের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা আরও কঠিন। কারণ বিপ্লবের সময় মানুষ একটি অভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক হয়; আর বিপ্লবের পর তাকে নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।
আজ তাই প্রশ্ন—জুলাই বিপ্লব দ্বিধাবিভক্ত কেন—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনও জুলাইয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই?
বাংলার আকাশে কি কোনো দিন এমন এক ভোর আসবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে নীতি বড় হবে? ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বড় হবে? দলীয় স্বার্থের চেয়ে মানুষের অধিকার বড় হবে?
সেই ভোর আসবে কি না, তা নির্ভর করছে আজকের আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর।
যদি আমরা বিভেদের দেয়াল ভেঙে আবারও ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে পারি, যদি ক্ষমতার মোহের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের স্বার্থকে বড় করে দেখতে পারি, যদি সুশাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে কেবল স্লোগান নয়—রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি করতে পারি, তবে জুলাইয়ের স্বপ্ন এখনও বেঁচে থাকবে।
আর যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাস হয়তো একদি
জুলাই বিপ্লবের ভাঙা আয়না: বিভেদের দায় কার?
প্রগতিশীল কন্ঠস্বর মোঃ সেলিম উদ্দীন ।
দুই বছরও পূর্ণ হলো না জুলাই বিপ্লবের। অথচ যে স্বপ্ন একদিন মানুষের চোখে নতুন ভোরের আলো জ্বেলেছিল, আজ সেই স্বপ্নের আকাশে জমেছে বিভেদের কালো মেঘ। যে কণ্ঠ একদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল, আজ সেই কণ্ঠের ভেতর শোনা যায় অভিযোগের প্রতিধ্বনি। যে হাত একদিন পরস্পরের হাত ধরে পরিবর্তনের পথে এগিয়েছিল, আজ সেই হাতের মাঝখানে সন্দেহ, প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার দূরত্ব।
জুলাই ছিল শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়; জুলাই ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ, অবহেলিত মানুষের আকাঙ্ক্ষার ভাষা, তরুণ প্রজন্মের সাহসী উচ্চারণ। সেখানে ছিল একটি স্বপ্ন—রাষ্ট্র হবে মানুষের, ক্ষমতা হবে জবাবদিহির, আইন হবে সবার জন্য সমান এবং ভবিষ্যৎ হবে বৈষম্য ও ভয়মুক্ত।
কিন্তু বিপ্লবের পথ যতটা উজ্জ্বল, তার পরের পথ ততটাই কঠিন। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ হতে পারে, কিন্তু ন্যায়ের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করা কঠিন। পুরোনো শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব, কিন্তু সেই ঐক্যকে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার মোহ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে ধরে রাখা আরও কঠিন।
আজ প্রশ্ন উঠছে—জুলাই বিপ্লব দ্বিধাবিভক্ত কেন?
এর উত্তর কোনো এক ব্যক্তি, কোনো একটি দল কিংবা কোনো একটি গোষ্ঠীর কাছে সীমাবদ্ধ নয়। এই বিভেদের দায় বহন করতে হবে সবাইকে—যারা বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা এর সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা করেছেন, যারা রাজনীতির পুরোনো পথ ধরে নতুন সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন এবং যারা নীরব থেকে বিভেদের আগুনকে জ্বলতে দিয়েছেন।
বিপ্লবের সময় মানুষ এক হয়েছিল একটি অভিন্ন স্বপ্নে। কিন্তু পরিবর্তনের পর সেই স্বপ্নের জায়গায় যখন ‘আমি’ বড় হয়ে ওঠে, তখন ‘আমরা’ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়। যখন আন্দোলনের ইতিহাসকে নিজেদের একার কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরার প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন ত্যাগের স্মৃতি বিভক্ত হয়। যখন জনকল্যাণের চেয়ে ক্ষমতার হিসাব বড় হয়ে ওঠে, তখন আদর্শের পতাকায় স্বার্থের ছায়া পড়ে।
আজ ক্যাম্পাস উত্তপ্ত, রাজপথ অস্থির, রাজনীতির আঙিনায় অনিশ্চয়তা। মানুষের মনে আবারও প্রশ্ন—যে পরিবর্তনের জন্য এত ত্যাগ, এত অশ্রু, এত রক্ত, সেই পরিবর্তনের ঠিকানা কোথায়?
মানুষ কি কেবল ক্ষমতার মুখ বদলাতে চেয়েছিল? নাকি তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে?
নতুন মুখ যদি পুরোনো আচরণে ফিরে যায়, নতুন নেতৃত্ব যদি পুরোনো ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে, নতুন দিনের রাজনীতি যদি আবারও দখল, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের পথে হাঁটে—তবে বিপ্লবের প্রকৃত অর্থ কোথায়? ক্ষমতার চেয়ার বদলালেই কি রাষ্ট্র বদলায়? পতাকা বদলালেই কি মানুষের ভাগ্য বদলে যায়?
রাষ্ট্র তখনই বদলায়, যখন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। যখন আইন ব্যক্তি বা দলের পরিচয়ে নয়, ন্যায় ও সত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। যখন প্রশাসন ক্ষমতাবানদের নয়, জনগণের সেবক হয়ে ওঠে। যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কারও পরিচয় জানতে হয় না। যখন বিচার বিলম্বিত হয় না এবং জবাবদিহি কেবল বক্তৃতার অলংকার হয়ে থাকে না।
আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই—আমরা ব্যক্তি ও দলকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় করে দেখি। আমরা নেতৃত্বকে প্রশ্ন করার পরিবর্তে তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করি। আমরা নীতির চেয়ে পরিচয়কে, রাষ্ট্রের চেয়ে দলকে এবং ভবিষ্যতের চেয়ে তাৎক্ষণিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দিই। ফলে মানুষ বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের পুরোনো ক্ষতগুলো রয়ে যায়।
তবু সব আশা কি শেষ?
না। ইতিহাসের পথ কখনো সরল নয়। প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পর আসে সংশয়, মতভেদ ও পথের দ্বন্দ্ব। কিন্তু সেই দ্বন্দ্ব যদি আত্মসমালোচনার পথ খুলে দেয়, যদি বিভাজন আমাদের আবারও মূল আদর্শে ফিরিয়ে নেয়, তবে এই সংকটও হতে পারে নতুন উপলব্ধির সূচনা।
আজ প্রয়োজন কৃতিত্বের মালিকানা নিয়ে বিবাদ নয়; প্রয়োজন দায়িত্বের অংশীদার হওয়া। প্রয়োজন কে কত বড় নেতা—সেই প্রশ্ন নয়; বরং কে কতটা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ—সেই প্রশ্ন। প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা নয়; বরং ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য হিসেবে গ্রহণ করা।
জুলাইয়ের চেতনা কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। এটি সেই তরুণের, যে ভয়কে উপেক্ষা করে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল; সেই মায়ের, যিনি সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত থেকেও পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন; সেই শ্রমজীবী মানুষের, যিনি ভেবেছিলেন—হয়তো এবার রাষ্ট্র তার কথাও শুনবে। জুলাইয়ের চেতনা বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা।
এই আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি থেকে নীতির রাজনীতিতে ফিরতে হবে। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের ভিত্তি করতে হবে। বিভেদ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—বিপ্লব ঘটানো কঠিন, কিন্তু বিপ্লবের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা আরও কঠিন। কারণ বিপ্লবের সময় মানুষ একটি অভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক হয়; আর বিপ্লবের পর তাকে নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।
আজ তাই প্রশ্ন—জুলাই বিপ্লব দ্বিধাবিভক্ত কেন—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনও জুলাইয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই?
বাংলার আকাশে কি কোনো দিন এমন এক ভোর আসবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে নীতি বড় হবে? ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বড় হবে? দলীয় স্বার্থের চেয়ে মানুষের অধিকার বড় হবে?
সেই ভোর আসবে কি না, তা নির্ভর করছে আজকের আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর।
যদি আমরা বিভেদের দেয়াল ভেঙে আবারও ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে পারি, যদি ক্ষমতার মোহের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের স্বার্থকে বড় করে দেখতে পারি, যদি সুশাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে কেবল স্লোগান নয়—রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি করতে পারি, তবে জুলাইয়ের স্বপ্ন এখনও বেঁচে থাকবে।
আর যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাস হয়তো একদিন কঠিন প্রশ্ন করবে—
যে স্বপ্নের জন্য মানুষ এক হয়েছিল, সেই স্বপ্নকে বিভক্ত করল কারা?
জুলাইয়ের প্রকৃত বিজয় কোনো ব্যক্তি বা দলের বিজয় নয়। জুলাইয়ের প্রকৃত বিজয় হবে সেই দিন, যেদিন ক্ষমতার চেয়ে নীতি বড় হবে, ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বড় হবে এবং লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে সুশাসন, ন্যায় ও জবাবদিহিতা।
সেই দিনের অপেক্ষায় আজও বাংলাদেশ।
কারণ বিপ্লবের শেষ কথা ক্ষমতা নয়—
বিপ্লবের শেষ কথা মানুষের মুক্তি।
https://slotbet.online/