প্রবাসীদের রক্তঘামে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধি: স্বীকৃতি ও সুরক্ষার অধিকার
সোহেল সরকার
আজ আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস। এই বিশেষ দিনটিতে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আমাদের প্রাণপ্রিয় রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও শুভকামনা। বাংলাদেশ নামের ছোট ভূখণ্ডটির অর্থনীতির চাকা প্রতিনিয়ত সচল রাখছেন যে সূর্যসন্তানেরা, তাঁরা আমাদের প্রবাসীরা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, প্রিয়জন ও জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে দূরে এক অচেনা-অজানা দেশে তিলে তিলে যাঁরা বাংলাদেশের সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ ও অবদান কোনো সাধারণ পরিমাপে মাপা সম্ভব নয়।
মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন প্রবাসে অবস্থানরত প্রতিটি ভাইকে ও বোনকে সুস্থ-নিরাপদ রাখেন এবং পরিবার ও দেশের অগ্রযাত্রায় আরও বিশেষ অবদান রাখার তাওফিক দান করেন। আমিন।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। আর এই অগ্রযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে কোটি প্রবাসীর অকাতর শ্রম ও কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, গ্রামীণ অর্থনীতির কায়াকল্প পরিবর্তন করা এবং কোটি পরিবারের আহার ও শিক্ষার সংস্থান—সবকিছুতেই প্রবাসীদের ঘামের প্রতিটি ফোঁটা মিশে আছে। প্রবাসীরা কেবল নিজ পরিবারের ভরণপোষণ করছেন না, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বা প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।
তবে আজ উদযাপনের পাশাপাশি আমাদের আত্মউপলব্ধি ও দায়িত্ববোধের দিনও বটে। আমরা কি সত্যি পেরেছি আমাদের প্রবাসীদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করতে? প্রবাসীদের এই বিপুল অবদানের বিপরীতে তাঁদের দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনার চিত্র এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ম্লান। বিদেশে যাওয়ার শুরুতেই দালাল চক্রের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ, প্রবাসে সঠিক কাজের পরিবেশের অভাব কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে আইনি সুরক্ষার অভাব—এমন অনেক সংকট আজও তাঁদের দৈনন্দিন সঙ্গী।
এমনকি নিজ দেশে ফিরলে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের যে হেনস্তা বা ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যে প্রবাসীরা দেশকে দেন অকাতরে, তাঁদের দেশে ফিরে কেন সম্মান ও সুবিধার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে?
আজকের এই যৌথ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—
১. নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন: কাজের সন্ধানে বিদেশগামী প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ, হয়রানিমুক্ত ও স্বল্পব্যয়ী অভিবাসন প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করা।
২. দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা: প্রবাসে বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাসগুলোকে প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যায় প্রকৃত ‘আশ্রয়স্থল’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং দ্রুত সেবা প্রদান নিশ্চিত করা।
৩. সম্মানজনক নাগরিক সুবিধা: বিমানবন্দরে হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ করা, প্রবাসীদের অর্জিত অর্থের সঠিক বিনিয়োগ ও তাঁদের পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা।
প্রবাসীরা কোনো অনুকম্পা চান না; তাঁরা চান শ্রমের মর্যাদা, সঠিক মূল্যায়ন এবং একটু আন্তরিকতা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসে কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রবাসীদের কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হোক আজকের প্রধান অঙ্গীকার।
আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কান্ডারি প্রবাসীদের প্রতিটি ফোঁটা ঘাম স্মরণীয় হয়ে থাকুক রাষ্ট্রীয় সম্মানে ও ভালোবাসায়। জয় হোক আমাদের প্রবাসীদের, জয় হোক বাংলাদেশের।
লেখক:
প্রকাশক ও সম্পাদক, বাংলা নিউজ মিডিয়া
https://slotbet.online/