বাঁশখালীতে গোপনে তড়িঘড়ি করে মাদ্রাসা ছাত্রীর বাল্যবিয়ে
বাধা দিয়েও বাল্যবিয়ে ঠেকাতে পারলেন না ইউপি সদস্য; অভিযোগ—অনুরোধ উপেক্ষা করে গোপনে সম্পন্ন বিয়ে
মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম চট্টগ্রাম বাঁশখালী প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় তড়িঘড়ি করে গোপনে এক প্রবাসী যুবকের সঙ্গে ১৬ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীর বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ এপ্রিল উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হাজী আলীমিয়া পাড়ার নুর হোছনের ছেলে, ওমানপ্রবাসী আইয়ুব আলীর সঙ্গে শেখেরখীল ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওসমান গণির মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকার বিয়ে সামাজিকভাবে সম্পন্ন করা হয়। আয়েশা সিদ্দিকা শেখেরখীল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার্থী।
এ ঘটনায় শিক্ষার্থীর সহপাঠী ও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এদিকে প্রতিকার চেয়ে শেখেরখীল ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য শামসুজ্জাহান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও অভিভাবকদের মাধ্যমে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ইউপি সদস্য শামসুজ্জাহান একাধিকবার বিয়ে বন্ধ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তার সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে গোপনে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। এতে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে ছনুয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী আবদুল হালিম জানান, “আমার কাছে বিয়ে পড়ানোর জন্য এলে প্রথমেই জন্মনিবন্ধন যাচাই করা হয়। ছেলে ২১ ও মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ না হলে বিয়ে পড়ানো হয় না। আইয়ুব আলী নামের ওই ব্যক্তি আমার কাছে এসেছিল। মেয়ের বয়স কম থাকায় আমি বিয়ে পড়াইনি। পরে জানতে পারি, এক হুজুরের মাধ্যমে কাবিননামা ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন করে মেয়েকে ছেলের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
ইউপি সদস্য শামসুজ্জাহান বলেন, “মেয়েটি ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার্থী। আগামী ২১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। এমন অবস্থায় বিয়ের আয়োজন করায় সে পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। আমি চেষ্টা করেও বাল্যবিয়ে ঠেকাতে পারিনি। কাবিননামা ছাড়াই প্রায় পাঁচ দিন ধরে মেয়েটি ছেলের বাড়িতে রয়েছে।”
আইন অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ দমন ও প্রতিরোধ আইনের ৭ ধারায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে সম্পন্ন করা অপরাধ হিসেবে গণ্য। এর জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বাল্যবিয়ে করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অভিভাবক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে সম্পন্ন করলে বা তাতে সহায়তা করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত বা ন্যূনতম ছয় মাস কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
শেখেরখীল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার নোমান বলেন, “বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়া জরুরি। আমার প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করবো।”
বাঁশখালী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জামশেদুল আলম বলেন, “আমি এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
https://slotbet.online/