নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ জালাল উদ্দিন।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এবং অনলাইন সহিংসতার বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় সৃষ্টি হচ্ছে বিভ্রান্তি, উত্তেজনা ও সহিংস পরিস্থিতির। এমন বাস্তবতায় তরুণ ও প্রবীণ সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা উন্নয়ন এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিকত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)-এর উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে দুই দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ২২ ও ২৩ মে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণ প্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠক এবং প্রবীণ সমাজের সদস্যরা অংশ নেন। কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল অনলাইন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য শনাক্তকরণ, ফ্যাক্ট-চেকিং দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তরুণ ও প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা জোরদার করা।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)-এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি ডিরেক্টর চৌধুরি সামিউল হক, গবেষণা কর্মকর্তা আবিদ হাসান এবং রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হুসাইন মুহাম্মদ রাইয়ান।
প্রথম দিনের কর্মশালায় বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য, ছবি ও ভিডিও যাচাইয়ের বিভিন্ন আধুনিক কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। রিভার্স ইমেজ সার্চ, তথ্যের উৎস বিশ্লেষণ, ভুয়া সংবাদ শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং টুল ব্যবহারের বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। কর্মশালাটি পরিচালনা করেন গবেষণা কর্মকর্তা আবিদ হাসান।
এ সময় বক্তারা বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ছবি বা ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনেক সময় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাই যেকোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বক্তারা আরও বলেন, দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে অনলাইন সহিংসতা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সমাজে আরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্বিতীয় দিনের সংলাপ কর্মসূচিতে তরুণ ও প্রবীণ সমাজের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনায় অনলাইন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সাইবার বুলিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহিংসতার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে যোগাযোগ সহজ হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার সমাজে নতুন ধরনের সংকট তৈরি করছে। যাচাইবিহীন তথ্য ও উসকানিমূলক প্রচারণা অনেক সময় সামাজিক বিভেদ ও অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ ও প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে সহযোগিতা, সচেতনতা এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি জরুরি।
সংলাপের একপর্যায়ে তরুণ অংশগ্রহণকারীরা শ্রীমঙ্গলে একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক ফ্যাক্ট-চেকিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবে বলা হয়, স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিমূলক ও ভুল তথ্য শনাক্ত করে তা যাচাইয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে সঠিক তথ্য তুলে ধরা হবে। একইসঙ্গে প্রবীণ সমাজকে ডিজিটাল বিভ্রান্তি সম্পর্কে সচেতন করতে তরুণরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে গুজব ও ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে এবং প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানান, এ আয়োজন তাদের তথ্য বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। তারা বলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে কোনটি সত্য আর কোনটি বিভ্রান্তিকর—তা যাচাই করার দক্ষতা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আরও জানান, এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও সংলাপ নিয়মিত আয়োজন করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলা সহজ হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বেসরকারি, অরাজনৈতিক ও অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সুশাসন, গণতান্ত্রিক চর্চা, নিরাপত্তা, নীতিনির্ধারণ, যুব উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
https://slotbet.online/