মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির উদ্যোগে বগুড়াস্থ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (গাক)-এর অডিটরিয়ামে ১৪ মার্চ ২০২৬, শনিবার “ব্যাংক–এমএফআই লিংকেজ আঞ্চলিক সেমিনার” অনুষ্ঠিত হয়েছে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও জয়পুরহাট জেলায় কর্মরত অথরিটির সনদপ্রাপ্ত ৬৮ টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ১৬ টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং এনবিএফআইয়ের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এমআরএ’র কর্মকর্তাগণ সেমিনারটিতে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঋণ সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণে ব্যাংক–এমএফআই লিংকেজের গুরুত্ব, প্রতিবন্ধকতা ও উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি (এমআরএ)-এর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া কার্যালয়ের পরিচালক সরদার আল এমরান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এমআরএ’র নির্বাহী পরিচালক মোঃ নূরে আলম মেহেদী। এছাড়া এমআরএ’র পরিচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন এমআরএ’র পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান।
স্বাগত বক্তব্যে মোঃ নূরে আলম মেহেদী বলেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে ব্যাংক–এমএফআই লিংকেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আঞ্চলিক সেমিনার ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, “ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর লিংকেজ প্রতিষ্ঠা করা গেলে তৃণমূল পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও ত্বরান্বিত হবে। এমআরএ এমএফ-সিআইবি এবং ক্রেডিট স্কোরিং বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে, যেখানে ব্যাংক ও এমএফআই উভয়ই দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।” এসময় আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য তিনি ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সরদার আল এমরান বলেন “ টেকসই অর্থনীতি বিনির্মান ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষিঋণ এবং এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির বিকল্প নেই এবং এই ক্ষেত্রে এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলোই মূল ভূমিকা পালন করতে পারে।”
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে মোহাম্মদ কামাল হোসেন উল্লেখ করেন যে, ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে সমগ্র ক্ষুদ্রঋণ খাতে ৪ কোটির অধিক গ্রাহকের মাঝে প্রায় ২ লক্ষ ৭৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে আর্থিক অধিগম্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর ফলে নিয়মিত ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর মাঝেও অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি আরও জানান, জুন’ ২০২৫ ভিত্তিক বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মোট তহবিল ১ লক্ষ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে প্রধান উৎস হলো গ্রাহকদের জমানো সঞ্চয়; যার পরিমান ৭৯ হাজার ৯ শত ৩২ কোটি টাকা যা মোট তহবিলের প্রায় ৪০%। এছাড়া ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানসমূহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো নিজস্ব মূলধন তহবিল যার পরিমান ছিল ৬৭ হাজার ৭ শত ৮৯ কোটি টাকা যা মোট তহবিলের ৩৪%।
ব্যাংকের মাধ্যমে এমএফআইয়ের তহবিল পূরন হয় ২২ হাজার ৪৯ কোটি টাকা, বা মোট তহবিলের ১২% এবং এটি তৃতীয় প্রধান উৎস। উক্ত উৎসের বাইরেও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানসমূহ অন্যান্য উৎস যেমন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ৭%, দাতা সংস্থা (০.০০১%) , সরকার ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক উৎস হতে তহবিল সংগ্রহ করে থাকে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অর্থপ্রবাহ জোরদার করতে অথরিটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বৈদেশিক ঋণ, বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং গৃহায়ন ঋণসহ বিভিন্ন অর্থায়ন উদ্যোগের ক্ষেত্রে এমআরএ ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের যাচিত প্রত্যয়নপত্র প্রদান করে থাকে, যা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
সেমিনারের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে এমএফআইয়ের প্রতিনিধিবৃন্দ ব্যাংকের ঋণের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এই সময় টিএমএসএস এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অশোকা ফেলো অধ্যাপিকা ড. হোসেন-আরা বেগম বলেন ‘ক্ষুদ্রঋণখাতে ছোট/মাঝারি এমএফআইগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণ প্যাকেজ চালুর প্রয়োজন, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসইভাবে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাতে সহযোগিতা করবে।’
গাক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. খন্দকার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ ক্ষুদ্রঋণের মাঠ পর্যায়ের কাজকে সুদৃঢ় ও গতিশীল করতে এমআরএ কর্তৃক ব্যাংক-এমএফআই লিংকেজ প্রোগ্রামটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
ওসাকা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান “ এমএফআই তহবিল সংগ্রহের জন্য ব্যাংকের শরণাপন্ন হলে তহবিল ব্যয় হিসেবে ১৩% সুদ প্রদান করতে হয়। উল্লিখিত হারে ব্যাংক হতে তহবিল সংগ্রহ করে ক্ষুদ্রঋণ খাতের গ্রাহকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করলে গ্রাহকদের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং এমএফআইগুলোর ঋণসমক্ষতা হ্রাস পায়।”
এছাড়া অন্যান্য বক্তাগণ জানান, “ক্ষুদ্র এমএফআইদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণ প্যাকেজ গঠন প্রয়োজন।”
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বক্তারা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংক ও এমএফআইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক সেবার পরিসর সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এবং যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি করবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ খাত ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রেস নোট/ এমআরএ
https://slotbet.online/