মোঃ সেলিম উদ্দীন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সৌরভ আর বর্ষা একই ব্যাচের ছাত্র ছিল।
একই ক্লাসে বসত, একই নোট পড়ত, একই পরীক্ষার টেনশন ভাগ করত। তবু আশ্চর্যভাবে তারা কখনো বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি, আবার প্রেমিকও হয়নি।
তাদের সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না।
বর্ষা খুব সাধারণভাবে কথা বলত।
অতিরিক্ত হাসি নেই, অকারণ আবেগ নেই।
কিন্তু তার উপস্থিতিটাই ছিল আলাদা। ক্লাসে ঢুকলে সৌরভ প্রথমে তাকাত বোর্ডের দিকে নয়, বর্ষার দিকে—সে এসেছে কি না, সেটুকু নিশ্চিত হতে।
বর্ষাও সৌরভকে লক্ষ করত।
সে জানত, সৌরভ তাকে পছন্দ করে।
সৌরভও জানত—বর্ষা জানে।
এই জানা–জানির মাঝখানেই তাদের সম্পর্ক আটকে ছিল।
তারা একসঙ্গে অনেক পথ হেঁটেছে—
টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর,
লাইব্রেরির সামনে সন্ধ্যার আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলা , কিন্তু নিজেদের নিয়ে কখনো নয়।
বন্ধু হলে যেমন অবাধ হওয়া যায়, তারা তা পারেনি। প্রেমিক হলে যেমন সাহস লাগে, সেটাও হয়নি।
ফলে তারা রয়ে গেছে মাঝখানে—
অস্বস্তিকরভাবে কাছাকাছি,
আবার নিরাপদ দূরত্বে।
সৌরভ মাঝে মাঝে ভাবত, একদিন যদি বলে ফেলে!
আবার পরক্ষণেই মনে হতো, বললেই কি সব ঠিক থাকবে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে সে জানত, অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হলে।
বর্ষাও ভাবত।
কিন্তু তার ভাবনায় বাস্তবতা বেশি ছিল।
সে জানত, এই পছন্দের কোনো কাঠামো নেই, ভবিষ্যৎ নেই।
তাই অনুভবকে সে নাম দিতে চায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো শেষ হলো।
ফাইনাল পরীক্ষা, বিদায়ের ছবি, বন্ধুবান্ধবের চিৎকার—সব ভিড়ের মধ্যে সৌরভ আর বর্ষা আলাদা করে কোনো বিদায় নেয়নি।
তারা আগের মতোই চুপ করে থেকে গেল।
কিছুদিন সৌরভের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।
মাঝে মাঝে ফোন, মাঝেমধ্যে ছোট বার্তা।
তবে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হলো।
শরীর আলাদা, জীবন আলাদা, সময় আলাদা।
একদিন বর্ষা হঠাৎ জানাল—সে দেশের বাইরে যাবে।
উচ্চশিক্ষার জন্য নয়।
স্বপ্নের কথা বলেনি।
শুধু বলেছিল, “এখানে থেকে কিছু হবে না।”
কিছুদিন পর সৌরভ জানতে পারল—বর্ষার বিয়ে হয়ে গেছে।
একজন অল্প শিক্ষিত প্রবাসীর সঙ্গে।
আমেরিকায় থাকে সে।
নিজের দোকান আছে, গাড়ি আছে, ছবি তোলা জীবন আছে।
বর্ষা আমেরিকার চাকচিক্য জীবন বেছে নিয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান নয়, দর্শন নয়—
নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা, ডলারের হিসাব।
সৌরভ কিছু বলেনি।
কারণ যে প্রেমের নামই দেওয়া হয়নি, তার হারিয়ে যাওয়ারও কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই।
শুরুতে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ ছিল।
ছবি আসত—গাড়ি, বড় বাড়ি, হাসিমুখ।
কিন্তু সৌরভ জানত, এই হাসির ভেতর বর্ষা পুরোটা নেই।
ধীরে ধীরে যোগাযোগও থেমে গেল।
বছর কেটে যায়।
সৌরভ দেশে থেকেই জীবন চালিয়ে নেয়—
কখনো অভ্যাসে,
কখনো দায়িত্বে,
কখনো নিছক বেঁচে থাকার জেদে।
বর্ষা তখন আর মানুষ নয়,
একটি স্মৃতি।
যাকে ছুঁয়ে দেখা যায় না,
কিন্তু ভুলে যাওয়াও যায় না।
সৌরভ জানে,
যে কথাগুলো বলা হয়নি, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
কারণ সেগুলোর কোনো সমাপ্তি নেই।
কিছু সম্পর্ক এমনই হয়,
না বলা ভালোবাসা,
না হওয়া বন্ধুত্ব,
না তৈরি হওয়া প্রেম।
তবু সেই সম্পর্কই সবচেয়ে বেশি থেকে যায়।
বর্ষা আজও সৌরভের জীবনে আছে,
কোনো ছবিতে নয়,
কোনো কথোপকথনে নয়,
শুধু নীরবতায়।
মুখোমুখি
বছর কেটে গেছে।
ঢাকা শহর এখনও তার আগের মতো, কিন্তু মানুষের মুখে বদল এসেছে, পথেও পরিবর্তন।
সৌরভ দেশেই থাকে সারাদিন চাকরির কাজ শেষ করে, জীবনের ধাক্কা সামলে।
ক্লাসরুমের সেই নীরব ছেলেটি এখন অন্য রকম, মাঝে মাঝে হাসে, মাঝে মাঝে চুপচাপ।
এক বিকেলে, টিএসসির পাশে পুরনো ক্যাফেতে কফি খেতে গিয়েছিল।
তার চোখে অজানা এক চিন্তাভাবনা, যেন পুরনো স্মৃতির খোঁজ।
হঠাৎ, একটি পরিচিত হাঁটার ছন্দ।
সৌরভের হৃদয় থমকে গেল।
সে যে মানুষটি মনে রাখত, বর্ষা।
বর্ষা ঠিক সেই মুহূর্তে চেয়ারে বসছে, কফি হাতে।
চোখে শান্তি, কিন্তু চোখের গভীরে কিছু না বলা আবেগ।
দূর থেকে সৌরভ তাকে দেখল, আর হঠাৎ মনে হলো—সব কিছু ঠিক আগের মতো, অথচ সব কিছু বদলে গেছে।
সে কাছে গেল, কিন্তু কোনো কথা বলল না।
বর্ষাও তাকাল, এবং তাদের চোখের নীরবতা সেই পুরনো দিনগুলোর মতো।
কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু সেই না বলা ভালোবাসা,
যা কখনো নাম পায়নি,
তবু এখনও বয়ে চলে।
“সৌরভ?”—বর্ষার কণ্ঠটা নরম, নীরবতার মধ্যে ভেসে আসল।
“বর্ষা…”—সৌরভের গলার শব্দও কেঁপে উঠল, কিন্তু বাক্য পুরো হয়নি।
তারা দু’জন একে অপরের কাছে বসল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
ক্যাফের ব্যস্ততা, রাস্তার শব্দ—সব যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
তাদের মধ্যে শুধু সেই নীরব সম্পর্ক, যা কখনো বন্ধু হয়নি, কখনো প্রেমিক হয়নি।
বর্ষা ছোট্ট হাসি দিল।
সৌরভও হেসে উঠল।
তাদের চোখে মিলল—এক ধরণের শান্তি, যা বছরের অভাবিত দূরত্বকেও মেটাতে পারে।
“তুমি… কেমন আছ?” সৌরভ ভেসে আসা কথা বলল।
বর্ষা নীরবতার মধ্যে শুধু চোখ নাড়ল।
কোনো উত্তর নয়—কিন্তু সব উত্তর সেই চুপচাপেই ছিল।
কফি শেষ হওয়ার পরে তারা বিদায় নিল।
কেউ কিছু বলল না, কেউ কিছু চাইল না।
শুধু সেই মুহূর্তে বোঝা গেল—যে সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না, সেটাই চিরস্থায়ী।
বর্ষা চলে গেল তার পথে, সৌরভ তার পথে।
কিন্তু এবার তারা জানত—না বলা ভালোবাসা কোনোদিন মরেনি।
না হওয়া বন্ধুত্ব, না হওয়া প্রেম, সবই তাদের মধ্যে নীরব, গভীর আলো হয়ে রয়ে গেছে।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন (আর্তমানবতার সেবায়) নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩