মোঃ সেলিম উদ্দিন
দেশের আর্থিক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের প্রবক্তা ড.ইউনূস স্যার জবরা ক্ষুদ্রঋণ পাইলটিং প্রোগ্রামের সেক্রেটারী জেনারেল জনাব জহিরুল আলম স্যার সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচীব ও অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গবৃন্দ সকলের প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা অভিনন্দন ও সালাম। আপনারা সকলেই ইতিহাসের অমর সাক্ষী হয়ে থাকবেন।
দীর্ঘদিন ধরে এনজিওনির্ভর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় আনলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কাঠামোর অনুপস্থিতি খাতটির টেকসই বিকাশে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করছিল।
প্রস্তাবিত ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সেই শূন্যতা পূরণের সম্ভাবনাই সামনে আনছে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের লাইসেন্স ও তদারকির দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত করা। এতে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিজ্ঞতা, জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম আরও সুসংহত হবে বলে আশা করা যায়। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন মানদণ্ড স্থাপিত হবে।
প্রস্তাবিত মূলধন কাঠামোও ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি এবং পরিশোধিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট করেছে যে এই ব্যাংক হবে আর্থিকভাবে সক্ষম ও দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার উপযোগী। বিশেষভাবে প্রশংসনীয় হলো—পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ আসবে ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিকদের কাছ থেকে। এতে করে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারাই ব্যাংকের অংশীদার হবেন, যা আর্থিক গণতন্ত্র ও মালিকানার বিকেন্দ্রীকরণের একটি শক্ত উদাহরণ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ব্যাংক পরিচালিত হবে সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। অর্থাৎ মুনাফাই হবে একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের মতো সামাজিক লক্ষ্যই থাকবে এর কেন্দ্রে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তও এই সামাজিক চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করে, কারণ এতে করে মুনাফাকেন্দ্রিক শেয়ার বাণিজ্যের চাপ থেকে ব্যাংকটি মুক্ত থাকবে।
বর্তমানে দেশে ৬৮৩টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ সদস্যকে সেবা দিচ্ছে, যাদের ৯১ শতাংশ নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়, ঋণ ও আর্থিক লেনদেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
যদিও শীর্ষ কয়েকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তবে এটিও সত্য যে নতুন কোনো কাঠামো প্রবর্তনের ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ থাকা স্বাভাবিক। সরকারের উচিত হবে—এই উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ জোরদার করা। তবে সামগ্রিকভাবে দেখলে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগটি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক ব্যবসা ও দারিদ্র্য বিমোচন প্রচেষ্টায় একটি ইতিবাচক ও সাহসী পদক্ষেপ।
সঠিক নীতিমালা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং অংশীজনদের আস্থার ভিত্তিতে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্রঋণ খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে—এমন প্রত্যাশাই আজ দেশের মানুষের।
মোঃ সেলিম উদ্দীন
পরিচালক, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম
আইডিএফ
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 0044 7574 879654
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন (আর্তমানবতার সেবায়) নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩